কাজ ফেলে রাখার পিছনে সাইকোলজি
কাজ পেছানো, যাকে আমরা সাধারণত প্রোক্রাস্টিনেশন বলে চিনি, আমাদের জীবনের একটি প্রচলিত সমস্যা। আমরা প্রায়শই কাজ করতে বসার সময় ঠিক সেই মুহূর্তে অন্য কিছুতে মনোযোগ দিই, এবং পরে কাজটি সম্পন্ন করার জন্য সময়ের সংকটে পড়ি। কিন্তু কেন আমরা এভাবে কাজ ফেলে রাখি? এর পেছনে মনস্তত্ত্ব কী কাজ করে? এবং কীভাবে আমরা এই সমস্যাটি কাটিয়ে উঠতে পারি?

প্রথমেই বলতে হবে, কাজ পেছানোর প্রধান কারণ হলো তাৎক্ষণিক আনন্দের প্রতি আকর্ষণ। আমাদের মস্তিষ্ক সহজাতভাবে সেই কাজগুলোর প্রতি আকৃষ্ট হয় যেগুলো তৎক্ষণাৎ আনন্দ দেয়। এই আচরণকে মনস্তত্ত্বে হেডোনিক ডিলে বলা হয়। যখন আমরা কোনও কঠিন বা সময়সাপেক্ষ কাজ করতে চাই, আমাদের মস্তিষ্ক তখন সহজ এবং আনন্দদায়ক কাজগুলোকে বেছে নিতে চায়, যেমন সোশ্যাল মিডিয়ায় সময় কাটানো, টিভি দেখা বা খাওয়া। এই আচরণটি আমাদের মস্তিষ্কের ডোপামিন রিওয়ার্ড সিস্টেম থেকে আসে, যেখানে সহজে প্রাপ্ত আনন্দ বা পুরস্কার মস্তিষ্কে ডোপামিন হরমোনের নিঃসরণ ঘটায়, এবং আমরা স্বস্তি পাই।
কাজ ফেলে রাখার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হল ভয়। কঠিন বা অজানা কাজের সামনে আমরা প্রায়শই আতঙ্কিত হয়ে পড়ি। মনে হতে পারে, কাজটি ঠিকভাবে করতে পারবো না, বা যদি ভুল হয়, তবে কী হবে? এই ধরনের নেতিবাচক চিন্তাগুলো আমাদের পারফেকশনিজম বা অতিরিক্ত নিখুঁত হওয়ার ইচ্ছা থেকে উদ্ভূত হয়। অনেক সময় কাজটি বড় মনে হলে বা তার জটিলতা বুঝতে না পারলে আমরা ভয় পেয়ে যাই এবং তা এড়িয়ে যাই।
এছাড়া, কাজ পেছানোর পেছনে আরও কিছু মনস্তাত্ত্বিক কারণ আছে, যেমন প্রক্রিয়ার প্রতি অনীহা। অনেকেই কাজ করতে বসলে ভাবেন যে পুরো প্রক্রিয়াটাই বিরক্তিকর হবে, এবং তাই তারা তা শুরু করতে চান না। আবার, সময়ের ভুল ধারণা বা টাইম ম্যানেজমেন্টের অভাবও একটি বড় কারণ। আমরা প্রায়ই ভাবি যে সময় অনেক আছে এবং পরে কাজটা করা যাবে, কিন্তু সময় শেষ হয়ে গেলে দুশ্চিন্তা বাড়ে।
কাজ ফেলে রাখার এই আচরণ থেকে মুক্তি পাওয়ার কিছু কার্যকর কৌশল রয়েছে। প্রথমেই, কাজটিকে ছোট ছোট ভাগে ভাগ করা খুবই উপকারী। বিশাল একটি কাজের দিকে তাকিয়ে আমরা ভয় পেয়ে যেতে পারি, কিন্তু যদি সেটাকে ছোট ছোট অংশে ভাগ করা যায়, তবে প্রতিটি অংশ সম্পন্ন করা সহজ হয়ে যায়। এই পদ্ধতিটি “টু মিনিট রুল” নামে পরিচিত, যেখানে বলা হয়, কোনও কাজ যদি দুই মিনিটে করা যায়, তবে সেটি সাথে সাথেই করা উচিত। এটি আমাদের মস্তিষ্ককে অল্প সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করার জন্য প্রেরণা দেয়।
আরেকটি কৌশল হলো ডেডলাইন বা সময়সীমা নির্ধারণ করা। যখনই কোনও কাজের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকে, তখন তা সম্পন্ন করার জন্য আমরা চাপ অনুভব করি এবং কাজটি ফেলে রাখা কঠিন হয়ে যায়। সময়সীমা আমাদের উপর দায়িত্ববোধ বাড়ায় এবং মনোযোগ বাড়াতে সহায়ক হয়।
কাজ শুরু করার ক্ষেত্রে ফোকাস বা মনোযোগ বৃদ্ধির কৌশলও অত্যন্ত কার্যকরী। কাজের পরিবেশে যদি কম বিভ্রান্তি থাকে, তাহলে মনোযোগ ধরে রাখা সহজ হয়। বিশেষ করে মোবাইল বা কম্পিউটারের অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ রাখা, নির্দিষ্ট সময়ে কাজ করার জন্য একটি স্থির পরিকল্পনা তৈরি করা ইত্যাদি কাজ ফেলে রাখার প্রবণতাকে কমাতে পারে।
ইতিবাচক পুরস্কারের ব্যবহারের মাধ্যমে নিজেকে পুরস্কৃত করাও একটি ভালো কৌশল। যখন আমরা একটি কাজ সম্পন্ন করি, তখন নিজেকে ছোটখাটো পুরস্কার দেওয়া যেতে পারে, যেমন প্রিয় কিছু খাওয়া, বা কয়েক মিনিটের জন্য বিরতি নেওয়া। এটি আমাদের মস্তিষ্কে একটি রিওয়ার্ড সিস্টেম তৈরি করে, যা পরবর্তীতে কাজটি শুরু করতে এবং চালিয়ে যেতে প্রেরণা জোগায়।
অতএব, কাজ ফেলে রাখার পেছনের মনস্তাত্ত্বিক কারণগুলো বোঝা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাৎক্ষণিক আনন্দের আকর্ষণ, ভয় বা সময় ব্যবস্থাপনার অভাবের মতো সমস্যাগুলো কাটিয়ে উঠতে চাইলে আমাদের সঠিক কৌশল প্রয়োগ করতে হবে। ছোট ছোট পদক্ষেপ, সময়সীমা নির্ধারণ, এবং ইতিবাচক পুরস্কার পদ্ধতি ব্যবহার করে আমরা প্রোক্রাস্টিনেশন কাটিয়ে উঠতে পারি এবং আমাদের কাজগুলোকে সময়মতো সম্পন্ন করতে পারি।



